গরম


অতিরিক্ত গরমে আমাদের সবার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে আছে। চলতে ফিরতে কোন কিছুতেই শান্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বড় থেকে ছোট সবাই কমবেশি গরমে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। জ্বর, ঠান্ডা, বমি পেট খারাপ খুব কমন সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়ে গেছে।

হাসপাতাল গুলোতে অসুস্থ রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে, বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ডগুলোতে জায়গা হচ্ছে না। হিট স্ট্রোকে প্রতিদিন মানুষ মারা যাওয়া খবর পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকাতে এভারেজ তাপমাত্রা ৩৯ থেকে ৪০ ডিগ্রী, এখন পর্যন্ত। চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ ৪৪ ডিগ্রি। স্কুল কলেজগুলো পর্যন্ত ছুটি দিয়ে দিয়েছে যাতে বাচ্চাদের কষ্ট না হয়।

গরম থেকে আরাম পেতে বাসা বাড়িতে বা অফিসে থাকা অবস্থায় সর্বপ্রথম যেটির কথা মাথায় আসে তা হলো এসি। যদিও অনেক জায়গায় এসি স্টক আউট দেখাচ্ছে। অনেকের জন্য এটি আবার বেশ ব্যয়বহুল। যেহেতু এটা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং ব্যয়বহুল আসবাব, তাই বুঝে শুনে দাম ক্রস চেক করে কেনা উচিত। যাতে করে বেশিদিন টিকে এবং বিদ্যুৎ বিল কম আসে। এজন্য ইনভার্টার এসি কেনা উচিত। এসি চালু থাকলে বিদ্যুৎ বিল অনেক বেশি আসে, এক্ষেত্রে ইনভার্টার এসি থাকলে বিল কিছুটা কম আসে। বর্তমানে কেনার জন্য ব্র্যান্ড হিসেবে গ্রী বা জেনারেল অথবা এলজি ইত্যাদি কোম্পানির নাম বেশি শোনা যায়।

যারা এসি কিনতে পারছিনা তাদের জন্য বাসায় আইপিএস অথবা জেনারেটরের লাইন নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। যাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে কষ্ট পেতে না হয়। যারা এটাও এফোর্ড করতে পারছি না তাদের জন্য বিদ্যুৎ চলে গেলে চার্জার ফ্যান একটা ভালো অপশন। আর গ্রামে প্রচুর বিদ্যুৎ চলে যায়, সারাদিন কারেন্ট থাকে না বললেই চলে। তাদের জন্য সোলার প্যানেল এবং চার্জার লাইট- ফ্যান ভালো অপশন হতে পারে।

বাসায় যাদের বৃদ্ধ মা-বাবা আছে এবং ছোট শিশু আছে তাদের জন্য আমাদের গরম থেকে আরাম পেতে উপরের যে কোন একটা ব্যবস্থা সাধ্যমত করা উচিত।

অনেকের টপ ফ্লোরে বাসা অথবা এমন দিকে বাসা থাকে যে রোদের তাপ পুরোটাই বাসার দেয়ালে পড়ছে। অনেকের আবার টিনের চালের বাসা। এই ধরনের বাসা গুলোতে রোদের তাপে প্রচন্ড রকমের গরম অনুভূত হয়। যারা এই বাসাগুলোতে থাকে তারা টের পায় কি পরিমাণ প্রচন্ড কষ্টকর একটা সিচুয়েশনে তারা বসবাস করছে। সন্ধ্যার পর যদি ও চারপাশে একটু ঠান্ডা হয়, হালকা-পাতলা বাতাস থাকে , কিন্তু এই ধরনের বাসা গুলোতে গরম কমে না। গরম দেয়ালের উত্তাপ বাসার ভিতরে তখন ছড়িয়ে থাকে।

এক্ষেত্রে গরম কমানোর জন্য নিম্নোক্ত উপায় গুলো চেষ্টা করে দেখা যায়-

১/ রুমে রুমে ভেজা টাওয়েল ছড়িয়ে রাখা, যেগুলো পুরনো হয়ে গেছে। অব্যবহৃত গেঞ্জি, ভারি প্যান্ট এ জাতীয় জিনিসগুলো আমরা ভিজিয়ে রুমের জানালা গুলোতে দিয়ে রাখতে পারি।

২/ যে রুমগুলোতে সরাসরি রোদের তাপ আসে সেই দেয়ালগুলোতে পুরনো চাদর ভিজিয়ে ছড়িয়ে দিয়ে রাখা।

৩/ বড় বড় বক্সগুলোতে পানি বরফ করে রেখে দিতে হবে সকাল থেকে। রাতের বেলা ঘুমানোর সময় সেই বক্স ভর্তি বরফ ছোট ছোট বালতি বা বোলে করে সাথে একটু পানি দিয়ে রুমের কোনায় কোনায় রেখে দিতে হবে।

৪/ যাদের ছাদের নিচেই বাসা তাদের আগে থেকেই চেষ্টা করা উচিত, তাদের মাথা বরাবর অংশটাতে গাছ অথবা মাচায় করে গাছপালা লাগানোর ব্যবস্থা করা। (যদি বাড়িওয়ালা অনুমতি দেয়।)

এই মিনিমাম করণীয় গুলো যদি আমরা করার চেষ্টা করি তবে বাসা বাড়ি প্রচন্ড উত্তাপ কিছুটা হলেও কমে যাবে। প্রচন্ড গরমে যখন ঠান্ডা পানি গুলো বাষ্পীভূত হতে থাকবে তখন রুমের তাপমাত্রা আগের চাইতে সহনীয় হবে, যা বেশ আরামদায়ক।

এ সময় গুরুপাক খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। কেননা দেখা যাচ্ছে বমি, পেট খারাপ সহ নানাবিধ অসুখে সব মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। সহজ পাচ্য খাবার , হালকা মসলা দিয়ে ঝোল জাতীয় খাবার, মাছ , সবজি ইত্যাদি খাদ্য তালিকায় রাখা উচিত। বেশি করে পানি, লেবুর সরবত, শসা, সালাদ খাওয়া উচিত‌।

শিশুদের মনে করিয়ে না দিলে তারা নিজ থেকে খুব একটা পানি খায় না ‌। তাদের বারবার পানি খেতে দিতে হবে। গর্ভবতী এবং স্তন্যদান কারিনী মায়েদেরও বারবার পানি জাতীয় খাবার খাওয়া উচিত, পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশ্রাম নেওয়া উচিত। গর্ভবতী মায়েরা এমনিতেই স্বাভাবিক মানুষদের চাইতে বেশি গরম অনুভব করে। তাই এই প্রচন্ড গরমে তাদের কষ্ট অসহনীয় হয়ে উঠছে। পরিবারের মানুষদের উচিত গর্ভবতী মায়েদের দিকে সহানুভূতির দৃষ্টি দেওয়া এবং তাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ আরামের ব্যবস্থা করা। গর্ভবতী মায়েদের নানা রকমের শারীরিক সমস্যা থাকে পুরোটা সময় জুড়ে। গরমের জন্য যখন তাদের এই সমস্যা দ্বিগুণ হয়ে যায় তখন সেটা বেশ অসহনীয় হয়ে পড়ে।

🙂

(গর্ভবতী মায়েরা এই সময়টা কিভাবে সুস্থ ভাবে কাটাতে পারে, তার জন্য প্রিনাটাল কোর্সটা করা অতীব জরুরী। Matritto – মাতৃত্ব মাতৃত্বে এখন ৮ম ব্যাচের ভর্তি চলছে। গর্ভবতী মায়েরা দেরি না করে এখনই এ কোর্সে এনরোল করে ফেলা উচিত। লাইভ বা রেকর্ডেড যেকোন টাতে। কারো ছাড় প্রয়োজন হলে আমাকে ইনবক্স করুন )

শ্রমজীবী মানুষদের সাহায্য করা উচিত। নরমাল সময়ের চাইতে ১০-১৫ টাকা বেশি দেওয়া উচিত, যাতে করে তারা তাদের কাজ সেরে দ্রুত বাসায় ফিরে যেতে পারে।

রিক্সাওয়ালা, নির্মাণ শ্রমিক অথবা দোকানদার টাইপের মানুষজন যারা রাস্তাঘাটে জিনিসপত্র বিক্রি করে তাদের কষ্ট এ সময় অনেক বেশি। বাসা বাড়িতে অব্যবহৃত টুপি, ছাতা থাকলে সেগুলো আমরা তাদের দান করে দিতে পারি, কারো সামর্থ্য থাকলে নতুন কিনে দিতে পারি। তাদের সাথে কথা বলার সময় মনে করিয়ে দিতে পারি যে তাদের সাথে পানির বোতল রাখা উচিত এবং একটু পরপর ছায়াতে গিয়ে বিশ্রাম নিতে হবে।

হিট স্ট্রোকে যেসব মানুষজন মারা যাচ্ছে তারা বেশিরভাগ এই ধরনের কর্মজীবী মানুষ যারা রোদে বেশি সময় থাকছে।

বাইরে বের হওয়ার সময় পর্যাপ্ত পরিমাণ সর্তকতা অবলম্বন করা উচিত প্রত্যেকের। টুপি , ছাতা, সানগ্লাস, পানির বোতল যাতে সবার কাছে থাকে। সানস্ক্রিন ক্রিম ব্যবহার করে বের হওয়া উচিত যাতে করে চামড়া পুড়ে না যায়। কোন প্রয়োজন ছাড়া সামনে বেশ কিছুদিন কারোই প্রখর রোদে বের হওয়া উচিত হবে না।

যার যার সাধ্যমত বাসা বাড়িতে বারান্দায় খালি জায়গাগুলোতে গাছ লাগিয়ে ফেলা দরকার। কিছু গাছ লাগানোর নির্দিষ্ট সময় থাকে। আবার কিছু ফুল, ফল, লতাপাতা সারা বছরই লাগানো যায়। সেগুলো জেনে নিয়ে আমরা আমাদের বারান্দাগুলোতে খুব সহজে টুকিটাকে গাছপালা লাগিয়ে নিতে পারি।

ষড়ঋতুর বাংলাদেশ এখন দুই ঋতুর বাংলাদেশ হয়ে যাচ্ছে। গরম এবং ঠান্ডা দুটোই সামনে আরো বাড়তে থাকবে। আমাদের বাসা বাড়ি কোনটাই খুব বেশি গরম অথবা খুব বেশি ঠান্ডার জন্য উপযোগী না। তাই এখন থেকেই পর্যাপ্ত পরিমাণ চিন্তা ভাবনা করে সে ধরনের সর্তকতা অবলম্বন করে আমাদের জীবন ধারণ করার জন্য চেষ্টা করা উচিত।

গরম কমার জন্য আল্লাহর কাছে বেশি বেশি করে দোয়া করা উচিত, ইস্তেগফার পড়া উচিত, বৃষ্টি পড়ার জন্য আলাদা করে নামাজ পড়া উচিত।

আর বৃষ্টি চেয়ে আমরা আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে দোয়া করি।

তিনবার বলতে হবে,

اَللّٰهُمَّ أَغِثْنَا

আল্লা-হুম্মা আগিসনা

হে আল্লাহ! আমাদেরকে বৃষ্টি দিন।

বুখারী ১/২২৪, নং ১০১৪; মুসলিম ২/৬১৩, নং ৮৯৭।

(হিসনুল মুসলিম)